: ** Published in
"কোলাজ শারদীয়া ১৪২৬" (KOLAJ_DurgaPujoEdition
2019)-
Hyderabad, India** :
শ্রাবন মাস ও বাঙালির ভূতের আড্ডা টা প্রায় ওতপ্রোত ভাবে
জড়িত।
অবশ্য ৫ তলায়
ভট্টচার্য্য জ্যেঠুর বাড়িতে আমাদের আড্ডা টা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা,বারো মাসের পার্বণ ছিল।
সে একবার বেজায় বৃষ্টি বাইরে,বেশ কনকনে আবহাওয়া,গুটিগুটি পায়ে আগেই পৌছে
গেলাম জ্যেঠুর ঘরে।
উত্তরের বারান্দার দরজাটা হা করে খুলে, ঠিক তার সামনে রাখা চেয়ার টা তে বসে, '.....বাহিরে
ঝড় বহে....' গাইতে গাইতে সিগারেট পাকাচ্ছে। আমাকে চশমার
ফাঁক দিয়ে দেখতে পেয়ে বললো, "বৃষ্টির ছাট আজ দক্ষিণে,
কুছ পরোয়া নাহি, চলে এসো। তবে একটা
আবদার আছে.." বলে সিগেরেটটা তে দুটো টান দিয়ে চশমার
ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,"আজ তুমি বরোদা, আমরা শুধু শুনবো। ভূতের গল্প ছাড়া আজ
কিন্তু জমবে না!"
জ্যেঠুর থেকে ভূতের গল্প শোনার লোভেই যে তখন হানা দিয়েছি,সে আর তখন স্বীকার করি কি করে!
ধরা পরে গেছি মার্কা হাসি দিয়ে বললাম,"তা একটু চেষ্টা করতে পারি।"
আড্ডা দলের বাকি সদস্যরাও সব উপস্থিত।জ্যেঠিমনি ততক্ষনে ৫কাপ
কফিও দিয়ে গেল,তার এক কাপে চুমুক দিয়ে জ্যেঠু বললো,"তাহলে আর দেরি কেন? এই বৃষ্টির রাতে কোথায়
নিয়ে যাবে আমাদের?"
কিছুক্ষন নিজের মনেই চুপ করে থেকে বললাম,"....গ্রীষ্মে ছুটি তে চলো।"
********
ছোটবেলার কিছু ঘটনা, কিছু মানুষ,
মনে এমন ভাবে থেকে যায় যে সেটা রোজ নাড়া না দিলেও, বিশেষ কিছু ঘটনা, কিছু পরিবেশ তাদের কে অবচেতন
থেকে আবারও স্পষ্ট করে তোলে। ঘটনা টার ঘনঘটা এতোই আকস্মিক ছিল যে সেটা আমাকে আজও মাঝে মাঝে ভাবায়।
আমার দাদুর বাড়ি ছিল বেহালা। স্কুলের গরমের ছুটি মানেই
ছিল আমার সেখান ঘুরতে যাওয়া।
এক মাস মা-বাবার থেকে দূরে, শুধু দিম্মার কাছে খাবো-খাবো বায়েনা আর
দাদুর কাছে এই-ওই বই কেনার বায়েনা। বলাই বাহুল্য সবই পূরণ হতো।
খেলার সঙ্গীর আমার কোনোদিন খুব একটা দরকার হয়নি কারণ
আমার এতই প্রবল ভাবনা শক্তি ছিল যে তার মধ্যে থেকেই দু-একটা ক্যারেক্টার জোগাড় করে নিতাম খেলার জন্য।
বিশাল তিনতলা বাড়ি, বাইরের বড় উঠন,
সেটা পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার বড়ো গ্রিলের গেট, এতো জায়গা থাকতেও আমার
কয়েকটাই বিশেষ খেলার জায়গা ছিল।
একটা ছিল দোতলার ছোট-ছাদ, আরেকটা তিনতলার বড়-ছাদ, আর সব থেকে পছন্দের জায়গা ছিল এক তলায় সিঁড়িঘরের নীচে।
ওটার একটা বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে ওখানে একটা রাস্তার দিকের
ছোট দরজা ছিল। দরজা টা খুলে দু চার ধাপ সিঁড়ি, আর তারপর একটা গ্রিলের ছোট গেট
যেটা পাড়ার রাস্তার দিকে খুলত। যদিও বেশির ভাগ সময় ওই দরজা টা বন্ধ থাকতো, তাও আমার একটা
অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল ওই জায়গা টার প্রতি। রোজ বিকেল ৪টে বাজতে না বাজতেই দিম্মা কে
টানতে টানতে নিয়ে ওখানে বসতে বলতাম আমার সাথে, কারণ একা দরজা খুলে
বসা বারণ।
অগত্যা দিম্মা গ্রিলের গেটে তালা লাগিয়ে, সিঁড়িঘরের দরজা টা খুলে দিত। চা এর কাপ হাতে, বাইরের
সিঁড়ি তে বসে আমার আকাশ কুসুম গল্প শুনতো।
আর তখনই হাতে একটা লাঠি নিয়ে ৩-৪টে গরু তাড়াতে তাড়াতে আসত রবি
পাগলা।
ছোট থেকে ওকে ওই নামেই জানি।
শুনেছিলাম খুব ভালো অবস্থা ওদের বাড়ির, বিশাল বাড়ি ছিল,কিন্তু ছেলেটা একটু খ্যাপাটে বলে বাড়ির লোকও ওকে দূর-ছাই
করতো।ছোট থেকেই বেচারার আলজীবটা না থাকায় জড়িয়ে জরিয়ে কথা বলতো।
ওই গরু গুলো ওদের ই গোয়ালের। কথা বার্তায়ে গলদ ও মাথায়
একটু ছিটের জন্য বাড়ির লোক সম্ভবত ওকে রোজ গরু চড়াতে পাঠাতো।
"এনাদের ঠিত মতো ধাস (ঘাস) দিয়া বাসায় না নিয়ে ডেলে আমায় ভাত দিবে
না ওরা।" একদিন দুঃখ করে বলেছিল।
আমার সাথে কিন্তু খুব গল্প করতো ওই জরানো ভাষাতেই।
ছোটখাটো দেখতে ছিল, মাথার চুল গুল এলোমেলো, অসমান দাঁত, তবে হাশি টা আকেবারে মন জয়
করার মতন।
দক্ষিণ কলকাতার একটা কংক্রিটের পাড়ায় ঘাস আর কোথায় পাবে।
"বাড়ির পাশে আগাছা হয়েছে,যা তোর গরু গুলো কে খাওয়া",মাঝে মাঝে বলতে
শুনতাম দিম্মা কে।
আমাকে দেখলেই বুঝত যে গরমের ছুটি তে এসেছি। রোজ একটা করে
টগর ফুল দিত আমাকে,"এই নাও বোন,আমার বাতানের (বাগানের)”।
দিম্মা দাদু এই ব্যপার টা খুব একটা পছন্দ করতো না ঠিকই
কিন্তু আমাকে কোনোদিনও বারণ করেনি।
সেইবার আমার ফিফথ স্ট্যান্ডার্ড।
ছুটির গন্তব্য দাদুর বাড়ি।
প্রত্যেকবারের মতো এবারও বিকেলেই খেলা টা সিঁড়িঘরের
দরজার সামনেই।
"এই তো বোন! ছুতি
হল?"
আমাকে দেখতে পেয়ে রবি পাগলার আহ্লাদের প্রশ্ন।
দিম্মা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে আবার চা এর গ্লাস আর
গল্পের বই এর দিকে মন দিলো।
আমি আমার ড্রইং খাতা থেকে মুখ তুলে দেখলাম এক গাল হাসি
নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুর্তিমান।
"হ্যা গো। এই তো কয়েকদিন হলো। অনেক হোম-ওয়ার্ক দিয়েছে স্কুলে এইবার।"
"ভালো,অনেহ লেতাপোরা
তরে বলো হও।"
"তা তো বুঝলাম, কিন্তু
আমার ফুল কই?" মজা করে জিগ্যেস করলাম।
"এই যাহ:!!! জানিনা
যে তুমি আছো!! আজ আবার তারাতারি বাড়ি যাবো, সুন্দরী টা ভালো নাই। তালতে আনব। দিব্যি।"
"সে ঠিক আছে কিন্তু সুন্দরী টা কে?"
অবাক হয়ে আবার জিগ্যেস করলাম আমি।
"ওই আমার নতুন তালো দরু টা (কালো গরু টা), জ্বর বোধহয়। আজ আসি বোন।"
বলে ৩টে গরু নিয়ে ছুট দিলো।
খুব কষ্ট লাগলো আমার,"দিম্মা,ওর গরুর জ্বর, ওষুধ পাওয়া যাবে?"
আমার করুন মুখ দেখে দিম্মা হেঁসে বললো "ওর সব কোথায় কান দিস না। মাথা টা পুরো খারাপ হচ্ছে যত দিন যাচ্ছে!
চল পার্ক থেকে ঘুরে আসি।"
গরমের ছুটির সবে এক সপ্তাহ কেটেছে, আর পরের সপ্তাহতেই হাজির হলেন কালবৈশাখী মহাশয়।
বাইর কালো করে অনবরত বৃষ্টি পরেই যাচ্ছে সঙ্গে বজ্রপাতে
কান ঝালাপালা। আর ভিতরে দিম্মার বেগুনি ভাজার গন্ধ। আহা! কি আরামের জীবনই না ছিল।
সেইদিনকার মতো দিন শেষ হলো খিচুড়ি আর আলুরদম দিয়ে।
পরের দিনের আকাশে গতকালের কালবৈশাখীর কোনো চিহ্ন নেই।
রাস্তায় ছড়ানো গাছের ডাল, পাতা আর কোনো এক
বাড়ির গামছা। সুন্দর ঝলমলে
আকাশ,
ঠান্ডা হওয়া দিচ্ছে, রোদের তেজ তখনও কম।
দুতলার ছাদে আমি কিৎ-কিৎ খেলছি। দিম্মা নিচে রান্নাঘরে
দুপুরের খাওয়ার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে আর দাদু কোনো এক কাজে বাজারে গেছে।
হঠাৎ নিচ থেকে রবি পাগলার গলা,"বোন! বোন!"।
দৌড়ে পাঁচিলের কাছে গিয়ে পা উঁচু করে নিচে তাকিয়ে দেখি
রবি পাগলা। এক হাতে এক গুচ্ছ টগরফুল আর এক হাথে লাঠি, পাশে একটা কালো গরু নিয়ে সিঁড়িঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো।
"এইদিকে, ওপরে তাকাও",
জোরে সারা দিলাম আমি।
সে ওপরে তাকিয়ে আমাকে দেখে এক গাল হেসে বললো,"তোমার, সব ফুল তোমার"।
"দাড়াও আমি আসছি", আমি আবার চেঁচালাম।
"না না আমার তাড়া আছে, এই যে সুন্দরী, ওষুধ চাই, নিতে যাচ্ছি, রাতলাম (রাখলাম), সিঁড়ির ওপর। পরে নিয়ে নিও।",
বলে ছোট গেটের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে রেখে দিল। তারপর
ওপরে তাকিয়ে,"এলাম" বলে
একগাল হাসি দিয়ে চলে গেল।
হঠাৎ বাইরের দরজার বেল বাজলো। 'ওই তো দাদু এসেছে', নিচে ছুটলাম, বাজার থেকে যদি জিলিপি আনে, তার লোভে।
দিম্মা ততক্ষনে দরজা খুলে দিয়েছে। গম্ভির মুখে আমাদের
দিকে তাকিয়ে বললো,"একটা খবর শুনলাম"।
"কি হয়েছে?" চিন্তিত
ভাবে জানতে চাইলো দিম্মা।
"রবি পাগলার দাদা নাকি গরুটা কে ডাক্তার
দেখানোর বাহানা তে একটা ছোট মাল নিয়ে যাওয়ার গাড়ি করে, দুজন
কে কাল ওই বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যে ময়দানে ছেড়ে দিয়ে এসেছে।ওই প্রচণ্ড বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ
এ গরু তো ময়দানে ভয় পেয়ে দিশা হারা হয়ে ছুট দিয়েছে আর তার পিছনে রবি যেই দৌড়েছে,
ওর দাদা উল্টো দিকে ফিরে একা বাড়ি চলে এসেছে।"
দাদু একটু থামলো।
"না বেচারার কাছে টাকা আছে,না জামা কাপড়,না বাড়ি চেনে। ও তো কোথাও
ইলেক্ট্রিকে শক খেয়ে পড়ে থাকবে!! মানুষ আর মানুষ নেই। ছি!
ছি!" বলতে বলতে দাদু হাথ-পা ধুতে চলে গেল।
দিম্মাও জিলিপির প্যাকেট টা নিয়ে রান্নাঘরে রাখতে গেল, আমি হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন ভাবলাম!
'ময়দান!! কি বলছে দাদু!!
সে তো অনেক দূর এখান থেকে। তবে যে সকালে আমাকে ফুল...…..তাই তো! ফুল!'
দৌড়ে দিম্মার কাছে গিয়ে বললাম,"একবার ছোট দরজাটা খুলবে প্লিজ?"
আমার চোখ মুখ দেখে সুবিধার মনে হলো না হয়তো,তাই তক্ষুনি ছোট দরজার কাছে গেলো। দরজা খুলে দিম্মা হতবাক!!
"এই এতগুলো টগর ফুল সুন্দর ভাবে বেঁধে রেখে
গেছে কে?"
তারপর থেকে ওখানে বসে আমি আর কোনোদিন খেলিনি।
আর কোনোদিন রবি পাগলা কে ওই পাড়ায় কেউ দেখেওনি।
আমিও না!
********
কিছুক্ষন সব চুপচাপ। কফি
কাপগুলো সবার ফাঁকা।
"আরেক রাউন্ড চলবে?" নীরবতা ভাঙাল জ্যেঠিমনি
এসে।
সবাই সমবেত সুরে "হ্যাঁ"জানান দিলাম।
"কষ্ট পাবো নাকি ভয়? দুটোই
সমান ভাবে হচ্ছে যে!",জানালো একজন।
"তেনারা আছেন আমাদের মধ্যেই,এইটাই বোঝা গেল।", আরেকজন বক্তব্য প্রকাশ
করল।
আজকের সন্ধ্যার তৃতীয় সিগেরেটটা তে শেষ টান দিয়ে জ্যেঠু
গম্ভীর ভাবে নড়েচড়ে বসলো,"ওই যে শীর্ষেন্দু
তেনাদের নিয়েই বলেছেন,'সদভাব রাখলে সকলের কাছ থেকেই কাজ
পাওয়া যায়',ওইটাই মোরাল অফ দা স্টোরি"।
এই অতুলনীয় বিশ্লেষণে সবাই হাসি তে ফেটে পড়লো।
********

No comments:
Post a Comment