Tuesday, 29 January 2019

জয়ন্তীর দিনরাত্রি


: ** Published in "কোলাজ  শারদীয়া ১৪২৫" (KOLAJ_DurgaPujoEdition 2018)-
Hyderabad, India** :


ঘড়িতে তখন সোয়া-সাতটা,ট্রেন প্লাটফর্ম ছুঁই-ছুঁই | দরজা টা খুলে মুখ বাড়ালাম বাইরে, নিউ আলিপুরদুয়ারের হাওয়া তে বেশ একটা ছুটির গন্ধ | গরমের ছুটির বেড়ানো টার  এই বছরেও কোনো ব্যতিক্রম হলো না | পাহাড় আর সমুদ্রের টাগ অফ ওয়ার এইবার জঙ্গলের জয় |
গন্তব্য: জয়ন্তী |

নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে জয়ন্তী ঘন্টা খানেক এর রাস্তা, গাড়িতেসোজা পিচ ঢালা রাস্তার দু-পাশে বক্সা ফরেস্ট | জঙ্গলের বুক চিরে আমাদের গাড়িটা এগিয়ে চললো এক অন্য সবুজের অভিযানে | এডভেঞ্চার প্রবন মন ওঁৎ পেতে বসে রইলো | কিছু হোক-কিছু হোক |
ফরেস্ট বাংলোটার নাম অবকাশ | জয়ন্তী নাদীর থেকে হাঁটা পথ | অল্প কংক্রিট আর বেশির ভাগ  কাঠ দিয়ে তৈরী, দুতলা একটা বাড়ি দিব্বি দাঁড়িয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে, দেখে খুব একটা মজবুত মনে না হলেও, ভরসা এটাই; সুতরাং উপায় নাই | বেশ সাবেকি আমলের কারুকার্য করা ঘর আর তার আসবাব-পত্র | দুতলা তে বাথরুম সহযোগে দুটো ঘর আর সব থেকে আকর্ষণীয় হলো একটা ছোট্ট বারান্দা,বেশ জঙ্গল এর দিকে চোখে চোখ দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে |
সকালের খাবার স্টেশন নেমেই সেরে ফেলা হয়েছে  তাই মংলু (বাংলোর কেয়ার টেকের) কে দেশি মুরগির ঝোল আর ভাত করতে বলা হলো দুপুরের জন্য | এই ফাঁকে সবাই একে একে স্নান সেরে ফেললো | বাবারা ভাই দের নিয়ে দিবা নিদ্রা দিলো | আর মায়েরা, মা সুলভ কিছু কাজ কর্ম করছিলো হয়তো | আমার দুটোর কোনো টা তেই ইন্টারেস্ট নেই |
তাই আমার খুড়তুতো বোন আর আমি সেই ছোট্ট বারান্দা টা তে রাখা বেতের চেয়ারের ওপর  ঠ্যাঙ তুলে আকাশ কুসুম গল্প জুড়লাম |
একদিন জঙ্গলে ঢুকলে কেমন হয়?
হঠাৎ যদি দেখি একটা লেওপার্ড সামনে, তাহলে কি হালুম সহকারে লাফাবে নাকি ভালো প্রতিবেশী দের মতো ঘুরে যাবে?
জয়ন্তী নদী তে কি সত্যি রাতে পরীরা নামে??…|

দুপুরের খাওয়াটা সেরে ফেলে আমরা বায়না ধরলাম ঘুরতে বেরোবো |
কে বলে ঘ্যানঘ্যান কাজ হয় না ?
দুদিকে গাছের ছায়া তে বোঝার উপায়ে নেই কোটা বাজে | গা শিরশিরানি কে কাঁচকলা দেখিয়ে আমরা  হাঁটতে হাঁটতে পৌছে গেলাম জয়ন্তী নদীর ধারে | বিশাল এক নদীর বেশিরভাগই খা-খা করছে বালিতে | সেই বিশালকায় নদীগর্ভের মাঝখানে মোটামোটি সরু হয় বয়ে  চলেছে জয়ন্তী নদী | ছোট হলে হবে কি? কি সুন্দর কলকল তার আওয়াজ, আর বেজায় জলের জোর, যেন প্রানপনে ছুটেছে  | নদীর অন্য প্রান্তে পাহাড় | আমাদের হিমালয়; আর তার ওই পারে ভুটান |
মাঝে মাঝে প্রকৃতির কাছে নিজেকে কেমন ছোট মনে হয় | এটা তেমনি একটা মুহূর্ত ছিল |

"হেথা দিনে তে অন্ধকার,
হেথা নিঝুম চারিধার" ~ গাইতে গাইতে আমরা ফেরত এলাম |

ঘড়ি বলছে বিকেলের চা এর সময় হয় গেছে |
নিচের বারান্দা টা তে চেয়ার জড়ো করে গোল হয় বসে চা এর সাথে টা হলো | দেখতে দেখতে চারিদিক যখন অন্ধকার হয় এলো, এই সময় মংলু এসে জবুথবু হয় বললো, "আজ্ঞে আপনারা ভিতরে গিয়ে বসেন | এখানে অন্ধকারের পর বসা ঠিক ভালো না|"
এই শুনে খুব একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়েই বাবা রা বললো, " আমরা সামলে নেবো| কি আর এমন হবে?"
মংলু সেই এক গলার স্বরে জবাব দিলো, "না বাবু তেমন কিছু না | তবে মাঝে মাঝে ওই বুনো হাতির পাল বেরোয় তো .....|"
"আর বেরিয়ে কি খুব একটা উৎপাত করে?"
"না বাবু খুব একটা না | তবে এই বাড়ির আসে পাশে মাঝে মাঝে  ঘোড়াঘোড়ি করে | লোকজনের আওয়াজ শুনলে এইদিকে আসতে পারে আর একবার যদি বারান্দার পিলার গুলো ধরে নাড়িয়ে দেয় তাহলে বাড়িটা ভেঙে যাবে |"
....জীবনে হয়তো এত উৎসাহের সাথে মা বাবা দের চেয়ার তুলে দৌড়োতে দেখিনি, আমরাও সাথে ছিলাম বলাই বাহুল্য |
ঘরে ঢুকে মংলু সেই একই স্বরে জিগ্যেস করলো, "রাতে তবে কি খাবেন আপনারা?",
তার কাছে হাতির পায়ে  চাপা পড়া আর রাত এর খাবারের মধ্যে বিশেষ তফাৎ নেই জেনে এক আতঙ্ক মিশ্রিত অট্ট হাসি তে ফেটে পড়লাম আমরা সবাই |

রাতে খাবার পর দুতলাতে উঠতে গিয়ে আরেক অভজ্ঞতা হলো |
এখানে বলে রাখা ভালো যে বাড়িটার সামনে পাশে কাঁটা তার এর বেড়া দেয়া তবে পিছনের দিক টা একটু অন্য রকম, ওখানে তারের সাথে সাথে বেড়া টা কাঠের, জঙ্গলের গভীরত্ব টাও স্বাভাবিক ভাবে অনেক বেশি | সিঁড়ি টা ওই পিছনের দিকেই | যদিও বাড়ির পিছনেরদিক টা পুরোটাই মোটা জাল  দিয়ে মোড়া; কিন্তু তার মধ্যে দিয়েও বাইরে টা স্পষ্ট দেখা যায় |
সেই ঝোপ-ঝড়ের মধ্যে হঠাৎ দেখি স্থির হয় রয়েছে দুটো জ্বলজ্বলে হলুদ রং, পূর্ণিমার আলোতে স্পষ্ট বোঝা গেলো গায়ের ছোপ ছোপ দাগ গুলো | মুহূর্তের মধ্যে, শিরদাঁড়া টা ঠান্ডা হয় গেলো | কাঠের মধ্যে আঁচড়ের আওয়াজ আর তার সাথে ডাল ভাঙার শব্দ; কয়েক মুহূর্ত পরেই আলো টা কেমন যেন নিভে গেলো, আরেকটু হলেই হালুম বলেছিলো বলে |
বুঝতে পারলাম যে তার এলাকা তে আমরা  অনুপ্রবেশকারী মাত্র | দেখা দিয়ে গেলেন আর কি!

সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরে গুটি গুটি পায়ে এসে দাঁড়ালাম দুতলার বারান্দা তে | সামনে বিশাল অরণ্য কে দেখতে দেখতে মনে হতে লাগলো যেন আমিও তাদের একজন | দূর থেকে ভেসে আসা গান আর অজানা রাত জাগা পাখির ডাক; এক অন্য জগৎ | সকালের সাথে রাতের জয়ন্তীর কোনো মিল নেই |
বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম, চাঁদের আলোটা দূরে নদীর বালি তে চকচক করছে, নাকি সত্যিই পরীরা নেমেছে? |
মহুয়ার গন্ধ আর শেষ রাতের জ্যোৎস্না যেন গ্রাস করে নিলো আমাকেও |


No comments:

Post a Comment